Arambagh Times
কাউকে ছাড়ে না
May 28, 2022

কাউকে ছাড়ে না

বিবেক চেতনায় জাগ্রত মন : মনোরঞ্জন সাঁতরা

1 min read

স্বামী বিবেকানন্দ ভারতের সুপ্ত চেতনাকে তার শান্তি ও ভ্রাতৃত্বের বাণী দিয়ে জাগ্রত করেছিলেন। তিনিই প্রথম ভারতীয় যিনি বেদান্ত ও যোগ দর্শন পাশ্চাত্যে প্রচার করেন। উত্তর কলকাতার সিমলা এলাকার দত্ত পরিবারের ছেলে নরেন্দ্র নাথ দত্তই হয়েছিলেন পরবর্তী জীবনে স্বামী বিবেকানন্দ।
তার জন্ম ১৮৬৩ সালের ১২ই জানুয়ারি। মা ভুবনেশ্বরী দেবী এবং বাবা বিশ্বনাথ দত্ত দুজনেরই যথেষ্ট প্রভাব ছিল তাঁর জীবনে।

কলকাতায় প্রেসিডেন্সি কলেজে কিছুদিন পড়াশোনা করার পর স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে স্নাতক পাশ করেন তিনি। পাশ করার ঠিক দুবছর আগে আঠারো বছর বয়সে তিনি যোগসাধক ও দার্শনিক রামকৃষ্ণ পরমহংসের সান্নিধ্যে আসেন। স্বামী প্রভানন্দ কথায় খুব অল্প বয়স থেকেই বিবেকানন্দের কিছু চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য দেখা গিয়েছিল।রামকৃষ্ণ পরমহংসের সান্নিধ্য বিবেকানন্দের জীবন দর্শনকে পুরোপুরি বদলে দেয়।এর মধ্যে কিছু ছিল তাঁর জন্মলব্ধ আর কিছু তিনি যে পরিবেশে জন্মগ্রহণ করেছিলেন তার অবদান। কিন্তু তাঁর জীবনে সবচেয়ে বেশি পরিবর্তন এনেছিলেন রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব।

বিবেকানন্দের সঙ্গে রামকৃষ্ণের যোগাযোগের সময়কাল ছিল মাত্র পাঁচ বছর।

প্রথমদিকে নরেন্দ্রনাথ রামকৃষ্ণ পরমহংসকে গুরু বলে মেনে নিতে অস্বীকার করেছিলেন। এমনকি তার চিন্তাভাবনার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ প্রকাশও করেছিলেন। কিন্তু রামকৃষ্ণ পরমহংসের ব্যক্তিত্বের প্রতি পরে তিনি বিশেষভাবে আকৃষ্ট হন ও তাঁকে গুরু হিসাবে মেনে নেন।

স্বামী প্রভানন্দ বলেছেন এই অল্প সময়ে গুরু শিষ্যের মধ্যে যেরকম সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল, সেটা ছিল খুবই বিরল: “দুজন দুজনকে নানাভাবে যাচাই করে দেখেছেন।”
রামকৃষ্ণের মৃত্যুর পর ব্রিটিশ ভারতের আর্থ সামাজিক অবস্থা দেখার জন্য স্বামী বিবেকানন্দ প্রায় পাঁচ বছর সারা ভারত ঘুরে বেড়ান।
তাঁর ভারত ভ্রমণের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তিনি দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরেছিলেন এবং সেসব জায়গায় শিক্ষিত, অশিক্ষিত, ধনী, নির্ধন সর্ব শ্রেণীর মানুষের সঙ্গে মিশেছিলেন। যার ফলে তাঁর চরিত্রে অসাধারণ কিছু গুণ এসেছিল। তাঁর জীবনদর্শন পরিপুষ্টতা লাভ করেছিল। এই সব কিছু নিয়েই গড়ে উঠেছিলেন বিবেকানন্দ।

তাঁর ভারত ভ্রমণের সময় বিবেকানন্দ সন্ন্যাসীর মত প্রধানত ভিক্ষা করে জীবনধারণ করতেন এবং মূলত পায়ে হেঁটে, আর কখনও বা অনুরাগীদের কেটে দেওয়া টিকিটে রেলপথে ভ্রমণ করতেন।

বিবেকানন্দ সারা জীবন ভারতীয় সঙ্গীতের একান্ত অনুরাগী ছিলেন। নিজে গান গাইতেনও ভাল।

মাত্র ২৩ বছর বয়সে তিনি সন্ন্যাসী হবার সঙ্কল্প গ্রহণ করেন।
বিবেকানন্দ শিকাগো ধর্মসভায় তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণ যখন দেন তাঁর বয়স তখন তিরিশ। ১৮৯৩ সালের ১১ই সেপ্টেম্বর ওই বিশ্ব ধর্ম মহাসভায় তিনি ভারত ও হিন্দুধর্মের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন।

শিকাগো ধর্মসভায় তাঁর বক্তৃতা ব্যাপক সাড়া ফেলে দেয়। এরপর তিনি আমেরিকা, ইংল্যাণ্ড ও ইউরোপে হিন্দু দর্শনের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে অসংখ্য সাধারণ ও ঘরোয়া বক্তৃতা দেন এবং ক্লাস নেন।

দু-বার তিনি ইংল্যাণ্ড ভ্রমণ করেন ১৮৯৫ এবং ১৮৯৬ সালে এবং সেখানে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় এক আইরিশ নারী মিস মার্গারেট নোবেলের, যিনি পরে পরিচিত হন ভগিনী নিবেদিতা নামে। বছর দুয়েকের মধ্যে তিনি কলকাতায় চলে আসেন স্থায়ীভাবে এবং স্বামী বিবেকানন্দের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন।
বিবেকানন্দ ১৮৯৭ সালের পয়লা মে আনুষ্ঠানিকভাবে রামকৃষ্ণ মিশন প্রতিষ্ঠা করেন। শিক্ষা ও সংস্কৃতির বিস্তার এবং চিকিৎসা ও দাতব্যকাজের মধ্যে দিয়ে জনগণের সেবার লক্ষ্য নিয়ে তৈরি হয়েছিল এই সামাজিক-ধর্মীয় আন্দোলন।
লেখক ও গবেষক, অধ্যাপক শঙ্করীপ্রসাদ বসুর মতে স্বামী বিবেকানন্দ শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছিলেন শুধু বাংলায় বা ভারতবর্ষে নয়, সারা পৃথিবীতে।
ত্যাগে, তপস্যায়, আনন্দে, যন্ত্রণায়, মানুষের প্রতি ভালবাসায় তিনি উন্মোথিত ছিলেন। ভারতবর্ষের ইতিহাসে তিনি বেদান্ত ভিত্তিক সেবাধর্মের প্রবর্তন করেন। সেবা হয়ে আসছে অনেকদিন ধরে। কিন্তু মানবসেবাকে একটা ধর্মসত্য রূপে উপস্থিত করেছিলেন স্বামী বিবেকানন্দ।
“তাঁর বিখ্যাত উক্তি ছিল -বহুরূপে সম্মুখে তোমার, ছাড়ি কোথা খুঁজিছ ঈশ্বর, জীবে প্রেম করে যেইজন, সেইজন সেবিছে ঈশ্বর।”
বিবেকানন্দ ভারতের সর্বব্যাপী দারিদ্রের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেছিলেন, এই দারিদ্র্য দূরীকরণের জন্যই ভারতে জাতীয় নবজাগরণের প্রয়োজন আছে।
স্বামী বিবেকানন্দকে নিয়ে গবেষণা করেছেন সাহিত্যিক শঙ্কর। বিবেকানন্দের উচ্চ চিন্তাধারা, আধ্যাত্মিক জ্ঞান ও সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা অনেক মানুষের জন্য প্রেরণা হিসাবে কাজ করেছে বলে তিনি মনে করেন।
বিবেকানন্দের জীবন আমার মনে হয় আমাদের মত সাধারণ মানুষের জন্যে বেঁচে থাকার একটা ওষুধ। সমস্ত প্রতিকূল অবস্থার বিরুদ্ধে কী করে আত্মপ্রকাশ এবং আত্মবিকাশের চেষ্টা করা যায় তা তিনি দেখিয়ে গেছেন।

মাত্র উনচল্লিশ বছরে তাঁর জীবনাবসান হয় ১৯০২ সালের চৌঠা জুলাই।

Please follow and like us:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *